দুই পৃথিবী
প্রায় বছর দশেক আগে ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলনে ইংরেজিতে প্রথম বর্ষের ছাত্র সৃজনের সাথে আলাপ হয় পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নন্দিতার। আলাপ ছাপিয়ে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব ছাপিয়ে নিজেদের অজান্তেই প্রেম। ক্যালেন্ডারের পাতার সাথে ঘুরতে থাকে বছর, বয়স। কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়। তার কয়েক বছর পর, পিএইচডি করতে নন্দিতা পাড়ি দেয় মুম্বাই। কর্মব্যস্ততা বাধ সাধতে পারেনি প্রেমে। রাজ্যের মানচিত্র, ঘড়ি, আবহাওয়া সব কিছু ছাপিয়ে দিনের অল্প হলেও সময় ছুঁয়ে যেত একে অপরকে। চুপ থেকেও বোঝানো যেত গভীর থেকে গভীরতর কথা। শুধু দীর্ঘশ্বাসেই ধরা দিত রকমারি অনুজ্ঞা। প্রায় চার বছর পর কলকাতা ফিরে পায় দুজনকে। বছর ঘুরতেই অধ্যাপনার সুযোগ আসে দুজনেরই। কলেজে পড়ানো দিয়ে শুরু হয় নতুন জীবন, ব্যস্ততা। আর ব্যস্ততার অজুহাতে অল্প অল্প করে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। অকাজের কথাতেও রাত কাটানো যায় এমন মানুষের সাথেই হয়ত সংসার করা উচিৎ। তবে কোনো কারণে দেখা করার আকাঙ্ক্ষাগুলো কমতে থাকে আর বাড়তে থাকে দেখা না করার অজুহাত। কাজের চাপ বরাবরই সুন্দর অকাট্য অজুহাত হয়ে দেওয়াল তুলতে থাকে দুজনের মাঝে। নির্ভেজাল প্রেম বছর কয়েকে পরিনতি পায় কিছু অহেতুক অকারণ নিয়মে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তাগিদে দুজনে একে অপরের প্রতি কেবলই নিয়ম পালন করতে থাকে। অবশেষে যোগাযোগ নেমে আসে ফোন থেকে স্যোশাল সাইটের ইনবক্সে। এক ঘেয়ে জীবনে রঙের হদিস দেয় ফেক অ্যাকাউন্ট। নতুন নতুন অচেনা মানুষের সাথে আলাপ, টুকরো টুকরো কথা কর্মব্যস্ততার এক ঘেয়েমি কাটাতে থাকে দুজনেরই। ততদিনে মেন অ্যাকাউন্টে ধুলো পড়তে পড়তে হারিয়ে গেছে টাইম লাইনে। সময়ের সাথে সাথে অচেনা মানুষের মধ্যেই বাছাই হতে থাকে ভালো মন্দ লাগার ওপর। কলেজ, পরীক্ষার খাতা, প্রশ্নপত্র, সেমিনার, ইউনিভার্সিটি, মিটিং, বন্ধুবান্ধব, নববর্ষ, বিজয়া দশমী সব কিছুর ভীড়েও গভীর রাতে, কথার টুকরো গুলো বাঞ্ছনীয় হতে থাকে। বৃষ্টি বা শীতের বহু রাত ফুরিয়ে গেলেও কথা ফুরোতেই চায় না।
ঝড়বৃষ্টির আগে গুমোট ভাব যতটা জরুরী, প্রেমের ক্ষেত্রেও ঝগড়ার গুরুত্ব ততটাই। সেমিনারের কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে হঠাৎই নন্দিতার সাথে দেখা হয় সৃজনের। এক বছর পর দেখা আর কয়েক মাস পর কথা বলতে গিয়ে সৃজন বেশ আড়ষ্ট বোধ করল। দেবদারু গাছের ছায়ায় দুজনের মধ্যে মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব, শত যোজন মনে হতে লাগলো। ওরা প্রথম অনুভব করল, এমনকি খুব আপন কোনো মানুষের চোখেও জ্ঞানত চোখ রাখা মুস্কিল!
পুরোনো গভীরতার অভাবটা ওদের মন ছাপিয়ে উথলে উঠে ইউনিভার্সিটির করিডোরে গড়াগড়ি খেতে লাগল। গভীরতা বা অগভীরতা কোনোটাই প্রমাণ করতে হয় না, হয়ে যায়। নিরবতা কাটাতে নন্দিতা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, "কি? কেমন আছিস?"
"ভালো। তুই?"
নিয়ম মাফিক প্রশ্নত্তোর শেষ হতেই দুজন দু'দিকে চলে গেল।
অতীত নয়, মানুষ আসলে অভাব বোধ করে, প্ল্যান মাফিক বর্তমান আর নিয়ম মাফিক ভবিষ্যতকে। এই দুটোর কোনটারই অভাব বোধ করেনি সেদিন ওরা কেউই। প্রেমটা অজান্তে শুরু হলেও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেমন বুঝিয়ে দিয়েছিল ঘটনাটা, সেদিনও তেমনি দ্বাদশ ইন্দ্রিয় বুঝিয়ে দিয়েছিল এটাই সম্ভবত শেষ দেখা আর অন্তত তাই হওয়া উচিৎ। দুজনের অন্তত এই একটা ইচ্ছে মিলেছিল সেদিন। কাজের মাঝে হারিয়ে যায় আবার দুজনে। শেষ-দেখার মত গুরুত্বপূর্ণ আর ভয়ঙ্কর কাজটা এত সহজে মিটে যাবে ভাবতে পারেনি ওরা কেউই।
যেকোনো শেষই কষ্টের। নিয়ম মাফিক ভবিষ্যতে থ্রিল থাকে না বটে তবে শান্তি থাকে। তবে মাঝে মধ্যে থ্রিল, ডালভাত শান্তির চেয়ে কাঙ্ক্ষিত হয়। কাজের ব্যস্ততায় মনের ব্যস্ততা চাপা পড়তে থাকে। নতুন করে ব্যস্ত হতে হতে, নন্দিতার ইচ্ছে করে ওপারের ফেক অ্যাকাউন্টকে সামনাসামনি দেখতে। নতুন করে নতুন কিছু শুরু করতে। অপ্রাসঙ্গিক কথাটা বলতে যখন বেগ পেতে হচ্ছিল, পেরোতে হচ্ছিল ঠিক ভুলের উঁচুনিচু রাস্তাটা, তখনই দেখা করার ডাক আসে একদিন হঠাৎ। উচিৎ অনুচিতের বাঁধ পেরিয়েই কেবলমাত্র কালো শার্টের ভিত্তিতেই, সর্ম্পূণ অচেনা মানুষটার সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করল। শিবরাত্রির আগের দিন নিরামীষ খাওয়ার অভ্যেসটা ওর দিদার থেকে পাওয়া। সেই খাতিরেই পার্ক স্ট্রীটের বদলে রবীন্দ্র সদন স্থির করতে হয়। অচেনা মানুষকে নিয়ে নানা রকম মেয়েলি আগ্রহ আর ভয় নিয়ে কানের দুল এটার বদলে ওটা হল, রিংটোন বদলালো। পারফিউম বাছতেও সময় লেগে গেল খানিকটা।
বারো বছর আগের মিউজিক কনফারেন্সের দিনটা মনে ভাসতে লাগল, ভাসতে লাগল গত সপ্তাহের করিডোরের স্মৃতিটা। একটু একটু করে ফিরে যেতে ইচ্ছে করল অতীতে। ইচ্ছে করল চেনা গন্ধের কাঁধে মাথা রাখতে, ইচ্ছে করল সেই চেনা মাপসই মুঠোয় আটকে যেতে। ইয়ারফোনের সান্নিধ্যে নতুনের আগ্রহ আর পুরনো অভিজ্ঞতা ঘেঁটে যেতে লাগল। তবে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। সৃজন বদলেছে। ওরও বদলানো উচিৎ। ইয়ারফোনের তালে তালে পা ফেলে সদন স্টেশানের সিঁড়িগুলো দ্রুত ভাঙতে লাগল নন্দিতা। সৃজন অতীত। এটা নতুন সন্ধ্যে। সব নতুন। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করতে করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে রবীন্দ্র সদন মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে সিগারেটে গোটা কয়েক টান দিয়ে স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। রাস্তা পেরিয়ে আধ খাওয়া সিগারেটটা পায়ের তলায় ঘসে, এক বুক ধুকপুকুনি নিয়ে ঘড়িটা একবার দেখে হল্দিরামের কাঁচের দরজাটা ঠেলে ঢুকে পড়ল ও। কাঁচের এপারের নিস্তব্ধ কলকাতায় ফাঁকা যে চেয়ারটা নজরে পড়ল, তার সামনে কালো শার্ট পরা মানুষটা নির্বাক কাঁচের দিকে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে আর দাড়ি চুলকাচ্ছে যেভাবে গত সপ্তাহের ইউনিভার্সিটির করিডোরে দু'হাত দূরের নিস্তব্ধ প্রায় অপরিচিত মানুষটা চিন্তামগ্ন থাকলে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটত আর দাড়ি চুলকাতো।
নন্দিতা কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেমন আছিস?"
কলকাতায় সত্যিই কত কি ঘটে!
Comments
Post a Comment