রাত্রি হলে তবে
পুরোনো একটা গলিতে, পরপর বাড়ি গুলো নিজেদের মত করে একে অন্যের কাঁধ ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকে। যাদের শরীর জুড়ে ব্রিগেড চলার আহ্বান থেকে ধর্মঘট সফল করার রংচটা দেওয়াল লিখন। কোথাও ঝুলতে থাকে কম্পিউটার সেন্টার, কোথাও বা একঘন্টায় গ্যারান্টিসহ বশীকরণের বিজ্ঞাপন, যারা হাওয়ায় দুলতে দুলতে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে শহরের দিকে, বাড়ি গুলোর দিকে। যে বাড়ি গুলো কোলে নিয়ে থাকে ততোধিক রংচটা কয়েকটা মানুষকে। রাজনৈতিক রংবেরঙের পতাকা ওড়ে অল্প হাওয়ায়।তারা হয়তো কিছু বলতে চায় অস্ফুটে। ওদের শরীরজুড়ে লেপ্টে থেকে ঝোলে বহু বহু বছর আগের অকেজো টেলিফোনের তার, যার মধ্যে দিয়েই প্রেরিত হত টেলিফোন বুথ থেকে চাপা গলায় 'চারটেয় ভিক্টোরিয়ার সামনে' বা 'পারলে ভুলে যাস' বা অন্য কিছু। ওদের শরীর ঘেঁসে দাঁড়িয়ে থাকে লিকলিকে লম্বা ল্যাম্পপোস্ট। যারা আলো ছড়ায় গলিঘুঁজি থেকে শুনশান বড় রাস্তায়।
রাত গভীর হয়। চুপি চুপি এক হাতে ফোন নিয়ে, প্রায় নিঃশব্দে অন্য হাতেই ছাদের দরজার শিকল খুলে যায়। কোনো রকমে আধখানা রিং বাজতেই ওপ্রান্ত থেকে হুম-কার আসে। লাল আকাশের তলায় চাপা গলায় টপিক আকাশ পাতাল ওঠা নামা করে। মান অভিমানের ফোয়ারা ছুটে যায় সিগনাল ভেদ করে। ছুঁতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে ফোন ছেড়ে পাশে বসতে। কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতে খেয়েছিস কিনা, জল খেয়েছিস কিনা! ইচ্ছে হয় বকে দিতে; ইচ্ছে হয় বকা খেতে। ঠোঁট ছুঁয়ে যায় শব্দ প্রেরক ছিদ্রের গায়ে। অধিকাংশ সময়টাই দু'প্রান্ত চুপ করে থেকেই ঘন্টা কয়েক কেটে যায়। মাথার ওপর দিয়ে বাদুর উড়ে যায়। ছাদের দিকে তাকাবে না বলেই হয়ত মাথা হেঁট করা ল্যাম্পপোস্ট গুলো মুচকি হাসে। রাত আরো গভীর হয়। চড়া মেকআপের এক মহিলা রিক্সায় ওঠে। শরীর যখন আর সায় দেয় না, সামাজিকতা ভুলে সে তখন খুলে দেয় রিক্সার ঢাকনাটা। একটু মুক্ত বাতাসের লোভে; রকে ঝিমোতে থাকা মাঝবয়েসীর টিপ্পনী আর কাগজকুড়ানীর টিপ্পনী অগ্রাহ্য করতেই হয়। শরীর এলিয়ে যায় মন্থর রিক্সার সমব্যথী সীট টা জুড়ে। ক্লান্ত হয়ে সিগারেট ধরায়। প্রথম দেশলাইটা জ্বলে না ভালো। অস্ফুটে খিস্তি ছোটে রাগে, ঘেন্নায়। কিন্তু সেটা হয়ত আদৌ দেশলাইটার ওপর নয়। লাল সিন্থেটিকের আঁচলটা, কাঁধ থেকে গড়িয়ে কোলে নেমে আসে। রাত আরো গভীর হয়।
রাত গভীর হয়। কোটিপতি স্বপ্নে বুঁদ একজোড়া পা টলতে টলতে এগিয়ে যায় দুঃস্বপ্নের দিকে। ঘামে ভেজা জামার ভিতর হ্যাল হৃদয়ের উথাল পাতাল স্বপ্নগুলোর তাল কেটে যায় কুকুরের ডাকে। বিরক্তি লাগলেও মনটা নেমে আসে পিচের রাস্তায়। তার ইচ্ছে হয় কাঁদতে, ইচ্ছে হয় গলা ছেড়ে চেঁচাতে। গলির বাঁকে টাইম কলের উঁকিতে তার তেস্টা পায়। হাতে পায়ে জোর থাকে না; শুকনো কলতলায় পা মুড়ে বসে বহু কষ্টে কল খুললেও জল পড়ে না। সে রাগ দেখায় লোহার কলের ওপর। দু-চার ঘা বসিয়েও দেয়। লোহার কলটা চাপা হাসিতে কাঁপতে থাকে। কোটিপতি স্বপ্ন, ঝগড়া করে কঠোর বাস্তবের সঙ্গে। যদিও বাস্তব তখন মুচকি হেসে পাশ ফিরে শোয়। বাড়ি গুলো তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। বহুভূজ আকাশে তখন লালের ছোপ। আবার কুকুর ডাকে। রাত আরো গভীর হয়। বিছানার পাশে দেড় জোড়া অন্তর্বাস মুখ থুবড়ে অস্ফুট অনুজ্ঞা গুলো শুনে যায়। কপালের ঘামে কুঁচো চুল গুলো লেপ্টে যায়। বন্ধ চোখে ক্লান্ত হওয়ার ইচ্ছে প্রকট হয়। খুলে রাখা কানের দুল জোড়া জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে বেড সাইড টেবিলের মায়াবি অন্ধকারে। দরজার ছিটকিনিও শুঁকতে চেস্টা করে ভ্যাপসা ঝাঁজালো গন্ধ গুলো। ভেন্টিলেটার থেকে চৌকো আলোকস্তম্ভ ঘরে আসে। মহাকাশে তখন ছায়াপথ দেখা যায়। কত নক্ষত্র ধ্বংস হয়, সৃষ্টি হয় কত নতুন নক্ষত্র। দেওয়ালের টিকটিকির ডাকে চাপা পড়ে যায় আরো কত কত শব্দ। পুরুষ আশ্রয় পায় নারী তে। রাত আরো গভীর হয়।
রাত গভীর হয়। মাধ্যমিকে স্টার পাওয়ার ইন্ডিউস্ড ইচ্ছে টা কে বাঁচিয়ে রাখতে টেস্ট পেপার খোলা থাকে বিছানায়। সাদা খাতায় সরল রেখাকে সমদ্বিখন্ডিত করতে গিয়ে নিষ্ঠুর কম্পাস ফুটো করে দেয় ও'পাতার রেচনতন্ত্র। দৃষ্টিরেখা চলে যায় ঝুলন্ত বিনুনীর সমান্তরালে। লোভ হয় পরীক্ষাপরবর্তী ফোন কেনার চিন্তা ভাবনায়। ডান হাতের নখ গুলো, অজান্তেই ছোট হয়ে যায়। স্টিলের স্কেল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বাঁ পায়ের নেল পলিশের কুঁচো গুলো জমা হয় বিছানার চাদরে। সেই ছেলেটার মুখটা ভেসে আসে। দূর দিয়ে মড়ার গাড়ি চলে যায়। রাত আরো গভীর হয়।
রাত গভীর হয়। ততোধিক গভীর হয় ইয়ারফোন আর মস্তিস্কের সম্পর্ক। গায়কের মেলাঙ্কলি সুরে ব্যর্থ প্রেমের দুঃখ প্রণোদিত হয়। প্রত্যেক অনুচ্ছেদে হৃদকম্প হারিয়ে যায়। পেঁচা ডাকে। কাঁদতে ইচ্ছে করে। হাসতে ইচ্ছে হয়। বেশ অনেকটা পিছনে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়; ইচ্ছে হয় নতুন করে শুরু করতে। কিন্তু ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে; বড্ড ই দেরী হয়ে গেছে। কুকুর ডাক আর জমাদারের গাড়ির শব্দ গুলো চাপা পড়ে যায় ইয়ারফোনের সৌজন্যে। রাত আর গভীর হয় না। আকাশ ফিকে হতে শুরু করে। নেটওয়ার্কিং সাইটে অজানা অচেনা রমণীর আগাপাস্তালা চিনতে ইচ্ছে হয়। মেকী অভিমান আর সস্তার খুনসুটির হরির লুঠ চলে। লজ্জা লজ্জা করেও বেরিয়ে পড়ে কবিতার গোটা কয় লাইন। এক পাশে শুয়ে শুয়ে কাঁধ ব্যাথা করে। মোবাইলের চার্জ সেদিনের মত জবাব দেয়। ভোরের কোমল বিছানা জুড়ে ঘুম আসে। আকাশ ফিকে হতে থাকে। খবরের কাগজের ভাঁজে ভাঁজে ঢুকে যায় ক্রোড়পত্র। দুধের গাড়ি আর ভেন্ডার কামড়ার মালপত্রে বাজারের মুখ গুলো বুজে যায়। শুকনো বরফের ভীড়ে কঠিন রুই কাতলা গুলো পিঠে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়ে চুপচাপ। রংচটা বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে রোদ উঁকি দেয়। সাইকেলের শব্দে শহর আরমোড়া ভাঙে। মাংসের দোকানের সামনে টাটকা বটপাতা জড়ো করা থাকে। এ'বাড়ি ও'বাড়ি থেকে অ্যালার্মের শব্দ ভেসে আসে। শহর জুড়ে শহুরে ভোর হয়। রংচটা মানুষগুলো আবার রাত হওয়ার অপেক্ষায় দাঁত মাজতে আরম্ভ করে।
![]() |
Photo Courtesy |
Comments
Post a Comment